চলতি সপ্তাহে হঠাৎ করেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ও ঢাকা গ্রাফিক আর্ট কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় সবমিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীরা আহত হয়েছেন।
মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের তিন বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ১৩ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ ছড়িয়েছে। এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষাঙ্গনে দেখা দিয়েছে পুরোনো সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতি ফিরে আসার শঙ্কা। এতে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। কেননা গত প্রায় দুই বছর ধরে দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল।
তথ্য বলছে, গত সোমবার (৩ আগস্ট) রাত থেকে বুধবার (৫ আগস্ট) পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
জকসু জিএসকে পিটিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন জবি ছাত্রদল আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলসহ নেতাকর্মীরা
ঘটনার সূত্রপাত হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারকে ‘জুলাই অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে টানানো ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শীর্ষক ব্যানারকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। ব্যানারটিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির ছয় নেতার ছবি ছিল। এ ঘটনায় অন্তত সাতজন আহত হন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ছাত্রদলকে ধাওয়া দিয়ে ক্যাম্পাসছাড়া করে ছাত্রশিবির।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে সংঘর্ষ শুরু হয়। ওই দিন জকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নসহ সমসাময়িক বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দিলে বাগবিতণ্ডা হয়, যা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে জকসু নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রদল-ছাত্রশিবির-ছাত্রশক্তির ৭০ জন আহত হন।
পাইপ হাতে আলিয়া মাদ্রাসার সামনে যুবদল নেতা নয়ন
ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এলাকার সামনেও। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং শহীদ সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
মারামারির ঘটনা ঘটেছে ঢাকা কলেজেও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একই দিন দুপুরে কলেজের গ্যালারি ২-এ শহীদ পরিবারকে সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় গ্যালারি ডেকোরেশনের দায়িত্বে থাকা শাখা শিবিরের অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেকসহ ৫-৬ জনকে কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ মোশারফের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন ছাত্রদলের নেতাকর্মী এসে অতর্কিত হামলা ও মারধর করেন। এ ঘটনার জেরে বিকেলে ঢাকা কলেজে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্য মারামারি হয়।
এদিকে আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ ও ছাত্রশিবিরের দুই সাথীর ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তিমূলক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ ওবায়দুল হকসহ উভয় সংগঠনের কয়েকজন আহত হন। বুধবারও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বিএম কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজেও মারামারি ও সংঘর্ষ হয়েছে।
দুই বা তিনদিনের ব্যবধানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হওয়া এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশের অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনেও এসব সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার। শিক্ষার্থীরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের হানাহানি-মারামারি কোন ভাবেই কাম্য নয়। কারণ আজ যে সকল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা পরস্পর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন তারাই দুই বছর আগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের পতন আন্দোলনে লড়াই করেছিলেন।
সংঘর্ষের জেরে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও হামলা হয়
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভ আহমেদ বলেন, কয়েকবছর যাবত ঢাকা কলেজে পড়ছি। ছাত্রলীগের আমলেও ছাত্রদল বা ছাত্রলীগ কখনো ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে মারামারি করেনি। বর্তমান সময়ে এই ঘটনা হতাশাজনক। সংঘর্ষ ছোট-বড় যেমনই হোক, রাজনৈতিক নেতাদের কোন একটা স্বার্থ থাকলেও চূড়ান্তভাবে ভুক্তভোগী হচ্ছে শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হোক, নইলে কঠোর কিছু বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হোক যেন কেও শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রিমু আহমেদ বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমরা নিরাপদ এবং মুক্ত চিন্তার ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেছিলাম। রাজনীতির মূল কথা হওয়ার কথা ছিল সহাবস্থান, দলমত নির্বিশেষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও সহিংস রাজনীতির পরিবর্তন হয়নি। জুলাইয়ের পরেও পেশিশক্তির দাপট দেখা খুবই হতাশাজনক। আমরা চাই সমস্ত লেজুড়বৃত্তিক, আধিপত্যবাদী ও পেশিশক্তির দাপট বন্ধ হোক।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী লাইলাতুল জেরিন বলেন, মঙ্গলবারের মারামারির পর ক্যাম্পাসে যেতেও ভয় লাগছে। জুলাইয়ের দুই বছর পর আবারও ক্যাম্পাসে যে ত্রাসের রাজত্ব, সংঘাতে রাজনীতি আর সহিংস পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি, তা খুবই হতাশাজনক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এমনকি হাসপাতালে ঢুকে হামলার মতো ঘটনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নিয়ে শঙ্কিত করে তোলে। বিগত দিনের মতো আবারও ‘হেলমেট বাহিনী’ আকারে রূপ নিচ্ছে কিনা, সেই ভয়ও কাজ করছে। আমরা কি আর কখনোই ক্যাম্পাসে একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং ভয়মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ পাব না?
তথ্য বলছে, গত সোমবার (৩ আগস্ট) রাত থেকে বুধবার (৫ আগস্ট) পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন মনে করছেন, এসব ঘটনার সূত্রপাত মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েই হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে কি সংঘাতের রাজনীতি ফিরে আসছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটা তো চব্বিশের পরপরই এসেছে, যখন একদল মনে করছে যে ইন্টেরিম সরকারের সময় তো আমি ক্ষমতায়, তখন যা ইচ্ছা তা করেছে তারা। এখন অন্যরা মনে করছে আমি ক্ষমতায়, আমরাও যা ইচ্ছা তা করব। আজকে যেটা হচ্ছে সেটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা না, অনেক আগেই শুরু হয়েছে; সামনে আরও হবে।
শিক্ষার্থীদের ভাগ্যের ব্যাপারে তিনি বলেন, তাদের আসলে কেউই দেখবে না, তারা নিজেরাও ভালোটা বোঝে না। বুঝলে শিক্ষায় এত কম বাজেট নিয়ে তারা চুপ থাকত না। এখানে শিক্ষার্থীরা বস্তির মতো জীবনযাপন করলেও কোনো প্রতিবাদ নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান ইস্যু আছে, শিক্ষার্থীর নিজের ইস্যু আছে, সেসব নিয়ে কথা না বলে তারা পড়ে আছে কোন নেতা কি বললো তা নিয়ে। আর কর্মী বাহিনীর বাইরে যারা আছে ওরাই আসল ভুক্তভোগী। তারাই মার খাবে, তারাই মারা যাবে, ওদের বাবা-মা-ই সাফার করবে। কারণ দেশের নেতাদের সন্তানেরা এদেশে একজনও পড়ে না।
শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর করণীয় জানতে চাইলে অধ্যাপক মামুন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক আগেই দলীয়করণ হয়ে গেছে। চব্বিশের পরে ইন্টেরিম সরকার তার মতো করে দলীয়করণ করেছে, এখন আরেকটু বেশি করে দলীয়করণ হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে তারাও দলীয়করণ করেছে। মূলত আমরা কেউই ভালো না।

